সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র বিছানাকান্দি। স্বচ্ছ জলরাশি, পাহাড় আর পাথরের অপরূপ সৌন্দর্যে প্রতিবছর হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে এলাকাটি। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই লীলাভূমি এখন পাথরখেকো সিন্ডিকেটের দখলে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি খাস জমিকে নিজেদের মালিকানাধীন দাবি করে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অভিযোগ আরও গুরুতর। স্থানীয়দের দাবি, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে প্রশাসন ও পুলিশের কিছু সদস্যের নীরব ভূমিকা থাকায় প্রকাশ্যেই পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিছানাকান্দি গ্রামের যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিচয়ধারী জয়নাল, আফজাল এবং মাসুম আহমদ, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা সরকারি খাস জায়গাকে নিজেদের মালিকানাধীন দাবি করে প্রতিটি প্রায় ৩ হাজার ঘনফুট ধারণক্ষমতার পাথরবোঝাই নৌকা বা বাল্কহেড থেকে ‘জায়গার ভাড়া’ নামে দুই লাখ টাকা করে অবৈধ চাঁদা আদায় করছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, চাঁদা পরিশোধ না করলে কোনো নৌকাকেই পাথর উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয় না। প্রতিদিন শতাধিক নৌকা থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য গড়ে তুলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলেও পৌঁছে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের বিট অফিসার এসআই অমিত সিংহের নাম ব্যবহার করে প্রতিটি নৌকা থেকে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশি নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে পাথর উত্তোলনের সুযোগ করে দিতেই এই অর্থ নেওয়া হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই অমিত সিংহ। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকা ইজারাভুক্ত। যদিও স্থানীয়দের প্রশ্ন, ইজারা যদি শুধু বাদেবাসা বালুমহালের হয়ে থাকে, তাহলে বিছানাকান্দিতে কীভাবে প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলন চলছে? এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রকাশ্যে দাবি করে বেড়াচ্ছেন যে, গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীকে ‘ম্যানেজ’ করেই তারা দিন-রাত অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, জায়গার ভাড়া বাবদ আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলে পৌঁছায় বলেই দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর কোনো অভিযান বা স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউএনও রতন কুমার অধিকারীকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প বা ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার করে নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকা এই কাজে অংশ নেয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভয়াবহ নদীভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অপরিকল্পিত ও অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে বিছানাকান্দির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নদীভাঙনের কারণে বসতভিটা, আবাদি জমি, খেলার মাঠ ও বিভিন্ন স্থানীয় অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়েছে। দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিছানাকান্দির অস্তিত্ব নিয়েও এখন শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
অভিযুক্ত জয়নাল, আফজাল ও মাসুম আহমদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ কল রিসিভ করেননি। ফলে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। একইভাবে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়লকেও একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা সিলেটের জেলা প্রশাসক, পুলিশের বিভাগীয় রেঞ্জ ডিআইজি, পুলিশ সুপার এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
তাদের দাবি, অবৈধ পাথর উত্তোলন ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধ উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ এবং বিছানাকান্দিতে স্থায়ী নজরদারি নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় দেশের অন্যতম এই পর্যটন কেন্দ্র অদূর ভবিষ্যতে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
Leave a Reply